পৃথুলা চলে গেল, ফিরে এল না…

অ্যাকুরিয়ামের মাছেরা তাদের ‘বোন’ পৃথুকে খুঁজছে কি না জানতে পারিনি। অনেক বছর ধরে পৃথুলা এই মাছদের দেখাশোনা করেন। খালাতো বোন অমি ও অঙ্কুর বলতেন, ‘পৃথু, এগুলো কিন্তু তোমার ভাইবোন। কত বছর ধরে তোমার সঙ্গে আছে।’ পৃথুলাও বিনা বাক্যব্যয়ে হেসে সে কথা মেনে নিয়েছিলেন।

১২ মার্চ থেকে ইউএস-বাংলা উড়োজাহাজের ফার্স্ট অফিসার, সেই ফ্লাইটের কো-পাইলট পৃথুলা রশীদের বাসাটা শূন্যপুরী। বাতাসে শুধু হাহাকার। একমাত্র সন্তানকে হারিয়ে স্তব্ধ হয়ে গেছে পৃথুলার মা রাফেজা বেগম ও বাবা আনিসুর রশীদের জীবন। মেয়েকে ঘিরেই ছিল তাঁদের জীবনের গতি। একটা দুর্ঘটনা থামিয়ে দিয়েছে তাঁদের। অমি, পৃথুলা ও অঙ্কুর সারাক্ষণ তিনজন একসঙ্গে থাকতেন। তাঁদের আদরের পৃথুকে হারিয়ে কিছুই যেন বুঝতে পারছেন না বোনেরা।

গতকাল শনিবার সকালে ঢাকার মিরপুর ডিওএইচএসে পৃথুলাদের বাসায় যখন যাই, বসার ঘর থেকেই তাঁর বাবার কান্না শুনতে পাচ্ছিলাম। কারও সঙ্গেই দেখা করতে চাইছেন না। একটু পরপর মেয়ের খোঁজ করছেন। বাবা আনিসুর রশীদ বহু বছর রাশিয়ায় ছিলেন, পেশায় ব্যবসায়ী। পৃথুলা যখন ক্লাস সিক্সে পড়েন, তখন তিনি দেশে ফিরে আসেন। মা-বাবা সময় ভাগ করে মেয়েকে দিতেন, মেয়ের যাতে একা না লাগে। মা রাফেজা বেগম একটি বেসরকারি সংস্থার সহকারী পরিচালক। যতটুকু সময় তিনি অফিসে থাকতেন, পৃথুলাকে সব জায়গায় নিয়ে যাওয়া-আসা বাবাই করতেন। মেয়েকে চোখে হারাতেন তাঁরা।

এ লেভেল, ও লেভেল পাস করে নর্থসাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি সাহিত্যে ভর্তি হলেন পৃথুলা। আবার বিমানচালক হওয়ার স্বপ্ন তাঁর। চলতে থাকল সাহিত্য পড়া ও বিমান চালনার প্রশিক্ষণ। বৈমানিক হলেন, দেড় বছর আগে ইউএস-বাংলায় যোগ দিলেন পৃথুলা রশীদ। মেয়ের স্বপ্ন ছিল মা-বাবারও স্বপ্ন।

পৃথুলার ঘরে গিয়ে দেখা গেল, তাঁর মা বিছানায় বসে আছেন। বুকের কাছে ধরে রেখেছেন পৃথুলার ব্যবহৃত পোশাক। একটু পরপর ঘ্রাণ নিচ্ছেন। পোশাকের মধ্যে মেয়েকে খুঁজছেন। তাঁর পাশে গিয়ে বসলাম, নিজে মোবাইল ফোন থেকে পৃথুলার একটা ছবি বের করে বললেন, ‘ও হচ্ছে আমার পরি, আমার বাবু। এত বাধ্য ছিল আমার মেয়েটা। এই শাড়িটা ( ছবি দেখিয়ে) পরবে বলে নিজ হাতে ব্লাউজ সেলাই করে দিয়েছি। আমার থাইরয়েড ক্যানসার। ওর সব সময় ভয় ছিল, আমি মরে গেলে কীভাবে থাকবে। আর আমাকে একা করে দিয়ে নিজেই চলে গেল, ফিরে এল না। শুনেছি, অন্যদের জীবন বাঁচাতে চেষ্টা করেছে। ও তো সব সময়ই এমন ছিল। স্যাররা যা ওকে শিখিয়েছে, তা-ই করেছে।’
বৈমানিক পৃথুলা রশীদ
বৈমানিক পৃথুলা রশীদ

যেদিন রাতে ফ্লাইট থেকে ফিরতেন পৃথুলা, বাসায় না আসা পর্যন্ত রাফেজা বেগম বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকতেন। এখন তিনি কার জন্য অপেক্ষা করবেন? তা বারবার জিজ্ঞাসা করছিলেন। যাওয়ার আগের দিনও মা-মেয়ে মিলে কেনাকাটা করতে গিয়েছিলেন। মেয়েকে নতুন জুতা কিনে দিয়েছেন মা।

‘পৃথুকে আমি বাবা বলে ডাকতাম। মেয়েটা সব সময় আমার এবং ওর বাবার কথা ভাবত। আমার ক্যানসারের চিকিৎসার জন্য পড়ালেখার সময় আউটসোর্সিংয়ের কাজও করেছে। বাইরে খুব একটা সময় কাটাতে চাইত না, বলত, “মা-বাবা বাসায় অপেক্ষা করছে।” আমরা কীভাবে আমাদের বাবাকে ছাড়া বেঁচে থাকব?’ পৃথুলার মায়ের এই প্রশ্নের উত্তর ঘরের কারও জানা নেই। পৃথুলার মায়ের চাওয়া, মঙ্গলবার মরদেহ এলে মিরপুর বুদ্ধিজীবী গোরস্থানে পৃথুলাকে সমাহিত করা।
জীবনকে ভালোবাসতেন, পশুপাখি ভালোবাসতেন এই বৈমানিক। খেতেও পছন্দ করতেন। অমি ও অঙ্কুর ছিলেন তাঁর শখের সঙ্গী। এর আগেও দুবার কাঠমান্ডুর ত্রিভুবন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বিমান চালিয়ে গেছেন। তৃতীয়বার গিয়ে আর ফিরলেন না হাসিখুশি আর সম্ভাবনাময় মেয়েটি।

যখন পৃথুলা রশীদের নিস্তব্ধ বাড়িটি থেকে ফিরছিলাম, রবীন্দ্রনাথের কিছু কথা মনে পড়ে গেল, যেন পৃথুলার জন্য লিখেছিলেন:
আমার প্রাণের ’পরে চলে গেল কে
বসন্তের বাতাসটুকুর মতো।
সে যে ছুঁয়ে গেল, নুয়ে গেল রে—…
ফুল ফুটিয়ে গেল শত শত।
সে চলে গেল, বলে গেল না—সে কোথায় গেল ফিরে এল না।
সে ঢেউয়ের মতন ভেসে গেছে, চাঁদের আলোর দেশে গেছে,
যেখান দিয়ে হেসে গেছে, হাসি তার রেখে গেছে রে…।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *